Women in Islam: ইসলামি সমাজব্যবস্থা, নারীর অধিকার ও বাস্তবতার অসামঞ্জস্য

ইসলাম - প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২৬, সকাল ১০:৫৬
unsplash image X2UAmIcpko

সামিউল গাজী: ইসলাম ধর্মের সমাজব্যবস্থায় নারীর জন্য সুস্পষ্ট অধিকার, মর্যাদা ও সম্মানের কথা বলা হয়েছে (Women in Islam)। নারীর ব্যক্তিত্ব, মতামত ও স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব সমাজে আমরা প্রায়ই দেখি, এই আদর্শগুলোর যথাযথ প্রয়োগ ঘটে না। এই আদর্শ ও বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকেই অনেক ক্ষেত্রে নারীবাদী আন্দোলন বা নারীর অধিকার রক্ষার দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।

ইসলামে বিবাহের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো মেয়ের ইচ্ছা ও মতামত ছাড়া তার বিয়ে সম্পূর্ণ বৈধ বলে গণ্য হয় না। এমনকি তাকে স্বতন্ত্রভাবে জিজ্ঞাসা করার নির্দেশনা রয়েছে, যাতে সে নির্ভয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়ায়। বাবা-মা বা অভিভাবকরা সমাজের সামনে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেন যে, আমার মেয়ের জন্য আমি বা আমরা যেটা ভালো মনে করি, সেটাতেই সে রাজি হবে (Women in Islam)। এতে করে মেয়েটির নিজের পছন্দ ও মানসিক প্রস্তুতির বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। অনেক সময় তাকে সরাসরি নয়, বরং পরোক্ষভাবে এমন পরিস্থিতিতে ফেলা হয়, যেখানে তার জন্য ‘না’ বলা কঠিন হয়ে পড়ে।

এছাড়াও সমাজে একটি বড় সমস্যা হলো—মেয়েদের যথাযথ শিক্ষা ও মানসিক বিকাশের সুযোগ না দেওয়া। অনেক পরিবারে মেয়েদের পর্যাপ্ত সময়, দিকনির্দেশনা ও সুযোগ না দিয়ে, মানসিকভাবে প্রস্তুত না করেই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক মেয়েই এমন এক জীবনে প্রবেশ করে, যার জন্য সে প্রস্তুত নয় এবং পরবর্তীতে নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়। একই সঙ্গে সমাজে একটি স্পষ্ট বৈষম্যও লক্ষ্য করা যায়—ছেলের শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, অথচ মেয়েদের ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব তুলনামূলকভাবে কম থাকে। অনেক পরিবারের ধারণা এখনো এমন যে, মেয়েকে তো একদিন অন্যের বাড়ি চলে যেতে হবে, তাই তার শিক্ষায় বা ব্যক্তিগত উন্নয়নে বেশি বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই। বিপরীতে, ছেলেকে ভবিষ্যতের ভরসা হিসেবে দেখে তার পিছনে বেশি সময়, অর্থ ও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সমাজে আরেকটি সংবেদনশীল দিক হলো—ছেলে সন্তানের প্রতি অতিরিক্ত আকাঙ্ক্ষা। অনেক ক্ষেত্রে একটি বা একাধিক মেয়ে সন্তান জন্ম নেওয়ার পরও পরিবার সন্তুষ্ট হয় না এবং একটি ছেলে সন্তানের প্রত্যাশায় মাকে বারবার সন্তান ধারণের জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে মায়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কথা উপেক্ষিত হয়। একের পর এক সন্তান জন্মদান ও তাদের লালন-পালনের অধিকাংশ দায়ভার তার উপরই এসে পড়ে, অথচ তার ইচ্ছা বা অস্বস্তির কথা অনেক সময় প্রকাশ করার সুযোগও থাকে না।

এই বাস্তবতাগুলোই আমাদের বুঝতে সাহায্য করে যে, নারীর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন বা নারীবাদী চেতনার উদ্ভব হঠাৎ করে হয়নি। বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, বৈষম্য ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অভিজ্ঞতা থেকেই এই সচেতনতা তৈরি হয়েছে। যখন কোনো নারী শিক্ষা ও সচেতনতার আলো পায়, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—কেন তাকে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখা হবে? কেন তাকে শুধুমাত্র সন্তান জন্মদানের মাধ্যম হিসেবে দেখা হবে? তার কি নিজস্ব মর্যাদা, ইচ্ছা ও ব্যক্তিত্ব নেই?

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও অনেক পরিবারে নারীর ভূমিকা যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। পুরুষ উপার্জন করে বলেই তাকে প্রধান হিসেবে বিবেচনা করা হয়, আর নারীর অবদানকে অনেক সময় গৃহস্থালির কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়। ফলে তাকে সহধর্মিণী বা সমান অংশীদার হিসেবে নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল বা অধীনস্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ “সহধর্মিণী” শব্দটির প্রকৃত অর্থ হলো—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমানভাবে পাশে থাকা একজন সঙ্গী। একইভাবে, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান—যেমন ঈদ বা অন্যান্য পারিবারিক উপলক্ষে—নারীর প্রাপ্য সম্মান, অংশগ্রহণ ও আনন্দ নিশ্চিত করার বিষয়েও অনেক সময় অবহেলা দেখা যায়। অথচ তাদেরও ইচ্ছা, চাহিদা ও স্বপ্ন রয়েছে, যেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। দুঃখজনকভাবে, অনেক সময় দেখা যায়—বাহ্যিকভাবে ধর্মীয় চর্চায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের মধ্যেও এই ধরনের বৈষম্য ও অবহেলা রয়ে যায়। ফলে সমস্যা ধর্মীয় বিধানে নয়, বরং সেই বিধানের ভুল বা অসম্পূর্ণ প্রয়োগে।

অতএব, আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণকে সমালোচনামূলকভাবে পর্যালোচনা করা।* যেন আমাদের সিদ্ধান্ত ও ব্যবহারের কারণে আমাদের মা, বোন বা কন্যা সন্তানের মনে কোনো বঞ্চনা বা অসন্তোষ জন্ম না নেয়। বরং আমরা যেন নিশ্চিত করতে পারি যে, *ইসলামের যে অধিকার ও মর্যাদা নারীদের জন্য নির্ধারিত হয়েছে, তা তারা বাস্তব জীবনেও যথাযথভাবে পাচ্ছে। সর্বোপরি বলা যায়, যদি ইসলামি আদর্শকে সঠিকভাবে বোঝা ও বাস্তবায়ন করা যায়, এবং একই সঙ্গে সমাজের প্রচলিত ভুল ধারণা ও বৈষম্য দূর করা যায়, তবে একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠন করা সম্পূর্ণ সম্ভব।

Scroll to Top