Hajre Aswad in Islam: ‘হাজরে আসওয়াদ’- কেন কোটি কোটি মুসলিমের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু?
‘হাজরে আসওয়াদ’ (Hajre Aswad in Islam)। কাবাঘরের দেয়ালে বিশেষভাবে স্থাপনকৃত একটি পাথরের নাম। আরবি ‘হাজর’ শব্দের অর্থ পাথর। আর ‘আসওয়াদ’ শব্দের অর্থ কালো। অতএব হাজরে আসওয়াদ মানে কালো পাথর। হাজরে আসওয়াদ। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে এটি একটি একটা কালো পাথর মনে হতে পারে (Hajre Aswad in Islam)। তার পরেও এটি কোটি কোটি মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্র। কিন্তু… আমরা কি জানি? কেন এ আকর্ষণ? বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হৃদয় প্রতিদিন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়—কাবা শরিফে। সেই পবিত্র ঘরের এক কোণে স্থাপিত একটি কালো পাথর হাজরে আসওয়াদ যুগে যুগে মুসলমানদের আবেগ, ভালোবাসা ও আনুগত্যের প্রতীক হয়ে আছে। এটি কেবল একটি পাথর নয়; বরং সুন্নাহর স্মৃতি, তাওহিদের পরীক্ষাক্ষেত্র এবং উম্মাহর ঐক্যের নীরব সাক্ষী। কেন এই পাথরকে ঘিরে এত ভালোবাসা, এত আগ্রহ? এর পেছনের শিক্ষা ও সীমারেখা কী- সেটাই জানা ও বোঝা আমাদের জন্য জরুরি।
কাবা শরিফের পশ্চিম কোণায় স্থাপিত হাজরে আসওয়াদের দিক থেকেই তাওয়াফ শুরু হয় এবং এ কোনায় এসেই তাওয়াফ শেষ হয়। হজরত ইবরাহিম (আ.) থেকে শুরু করে আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.), তার সাহাবীগণ এবং আজ পর্যন্ত অসংখ্য মুসলিম এই পাথরকে চুম্বন করেছেন।
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘হাজরে আসওয়াদ জান্নাত থেকে এমন অবস্থায় অবতীর্ণ হয়েছিল; যখন এটি দুধ হতেও বেশি সাদা ছিল। কিন্তু এটিকে আদম সন্তানের গুনাহ এমন কালো করে দিয়েছে।’ (তিরমিজি, ইবজে খুজায়মা, মিশকাত, তালিকুর রাগিব)। শুধু তাই নয়, হাজরে আসওয়াদ একটি আলোকপ্রভা, উজ্জ্বল পাথর ছিল। যার আলোকে নিষ্প্রভ করে দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে- হজরত আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি, ‘হাজরে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহিম জান্নাতের ইয়াকুত (দীপ্তিশীল মূল্যবান মণি) থেকে দুটি ইয়াকুত। আল্লাহ্ তাআলা এই দুটির আলোকপ্রভা নিম্প্রভ করে দিয়েছেন। এ দুটির আলোকপ্রভা যদি তিনি নিস্তেজ করে না দিতেন তাহলে তা পূর্ব-পশ্চিমের মধ্যে যা কিছু আছে সব আলোকিত করে দিত।’ (তিরমিজি, মিশকাত)
হাজরে আসওয়াদের ঐতিহাসিক তথ্য: ইসলামপূর্ব কোরাইশদের যুগে কাবা শরিফের গিলাফ যখন পুড়ে গিয়েছিল, তখন হাজরে আসওয়াদও পুড়ে গিয়েছিল। ফলে তার কৃষ্ণতা আরো বৃদ্ধি পায়। রাসূলের নবুয়তপূর্ব সময়ে কাবা পুনর্নির্মাণের পর হাজরে আসওয়াদ আগের স্থানে কে বসাবেন? এটি নিয়ে কোরাইশদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বেধেছিল। তখন মহানবী (সা.) নিজের গায়ের চাদর খুলে তাতে হাজরে আসওয়াদ রেখে সব গোত্রপ্রধানকে চাদর ধরতে বলেন। গোত্রপ্রধানরা চাদরটি ধরে কাবা চত্বর পর্যন্ত নিয়ে গেলে নবী করিম (সা.) নিজ হাতে তা কাবার দেওয়ালে স্থাপন করেন এবং দ্বন্দ্বের পরিসমাপ্তি ঘটান।আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)-এর শাসনামলে হাজরে আসওয়াদ ভেঙে তিন টুকরো হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি তা রুপা দিয়ে বাঁধাই করেছেন। আর তিনিই সর্বপ্রথম হাজরে আসওয়াদকে রুপা দিয়ে বাঁধানোর সৌভাগ্য অর্জনকারী।
• ১৭৯ হিজরিতে আব্বাসীয় খলিফা হারুনুর রশিদ হাজরে আসওয়াদকে হীরা দিয়ে ছিদ্র করে রুপা দিয়ে ঢালাই করেন।
• ৩১৭ হিজরিতে কারামতিয়ারা হারাম শরিফে অতর্কিত আক্রমণ করে হাজরে আসওয়াদ ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে ৩৩২ হিজরিতে ফিরিয়ে এনে চুনা দিয়ে তার চারপাশ এঁটে দেওয়া হয়।
• ৪১৩ হিজরিতে এক নাস্তিক লৌহ শলাকা দ্বারা হাজরে আসওয়াদের ওপর হামলে পড়ে। ফলে তা ছিদ্র হয়ে যায়। এরপর বনি শায়বার কিছু লোক তার ভগ্নাংশগুলো একত্রিত করে কস্তুরী দ্বারা ধৌত করে তার টুকরোগুলো ফের জোড়া লাগিয়ে দেয়।
• ১৩৩১ হিজরিতে সুলতান মুহাম্মদ রাশাদ হাজরে আসওয়াদের চারপাশে রুপার একটি নতুন বেষ্টনী তৈরি করে দেন।
• ১৩৫১ হিজরির এপ্রিলের ১৮ তারিখে বাদশাহ আবদুল আজিজ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও আলেম-ওলামাসহ কাবা শরিফে উপস্থিত হন এবং হাজরে আসওয়াদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য তাতে মেশকে আম্বরের মতো মূল্যবান পাথর সংযুক্ত করেন।
• ১৪১৭ হিজরিতে পবিত্র কাবাঘরের সঙ্গে হাজরে আসওয়াদেও বিশেষ রুপার দ্বারা নতুন বেষ্টনী স্থাপিত হয়।
হাজরে আসওয়াদ চুম্বনের ফজিলত: হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করা বরকতময়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন এ পাথর আবু কুবাইস পাহাড় থেকে বড় আকার ধারণ করে উপস্থিত হবে। তার একটি জিহ্বা ও দুইটি ঠোঁট থাকবে, (বায়তুল্লাহর জিয়ারতকারীরা) কে কোন নিয়তে তাকে চুম্বন করেছে, সে সম্পর্কে বক্তব্য দেবে।’ (ইবনে খুজায়মা; মুসতাদরাকে হাকেম )
নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ পাথরটিতে চুম্বন করেছেন; তাই মুসলিম উম্মাহর জন্য এ পাথরটি চুম্বন করা সুন্নাত। আর কাবা শরিফ তাওয়াফকালে এ পাথরটি চুম্বন বা স্পর্শ সম্ভব না হলে এর দিকে ইশারা করে তাওয়াফ শুরু করাও সুন্নাত।
আবদুল্লাহ ইবনে সারজিস (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আল-উসায়লিহ্ অর্থাৎ উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) কে দেখলাম যে, তিনি হাজরে আসওয়াদে চুমা দিচ্ছেন আর বলছেন, আমি অবশ্যি তোমাকে চুম্বন করছি। আমি নিশ্চিত জানি যে, তুমি একটি পাথর মাত্র, তুমি ক্ষতিও করতে পারো না এবং উপকারও করতে পারো না। আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে তোমায় চুমা দিতে না দেখতাম তাহলে আমিও তোমায় চুমা দিতাম না।












