Nakba day demonstration UK 2026: লন্ডনের রাজপথে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে মহাজাগরণ: স্বাধিকারের লড়াইয়ে বিশ্ববাসীর অভূতপূর্ব সংহতি!
Nakba day demonstration UK 2026- ১৯৪৮ সালের সেই অভিশপ্ত ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয়ের কালো দিনটি আজও ফিলিস্তিনিদের বুকে এক জীবন্ত ক্ষত। জায়নবাদী ইসরাইলের নির্মম বর্বরতা আর নিষ্ঠুর উচ্ছেদের শিকার হয়ে সেদিন লাখ লাখ ফিলিস্তিনি রাতারাতি হারিয়েছিলেন তাদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি। যুগের পর যুগ ধরে চলা ইসরাইলি আগ্রাসন আজ তাদের নিজ ভূমিতেই করে রেখেছে পরবাসী ও ভিনদেশী। স্বাধিকার হারানো সেই নিপীড়িত মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা আর আন্তর্জাতিক নীরবতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিতেই এবার যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের রাজপথ কাঁপিয়েছে এক সুবিশাল জনস্রোত। ফিলিস্তিনপন্থি এই ঐতিহাসিক সমাবেশে চোখে বুকভরা বেদনা আর মুখে প্রতিরোধের স্লোগান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ (Nakba day demonstration UK 2026)।
উত্তপ্ত লন্ডন এবং দুই বিপরীতমুখী সমাবেশ
লন্ডনের এই সমাবেশটি মূলত আয়োজিত হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের ঐতিহাসিক নাকবা দিবস স্মরণে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের ধারণা, ফিলিস্তিনপন্থি এই সংহতি কর্মসূচিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে একই দিনে লন্ডনের রাজপথে উত্তেজনা ছড়ায় উগ্র ডানপন্থি নেতা টমি রবিনসনের ডাকে আয়োজিত ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ শীর্ষক আরেকটি পাল্টা সমাবেশ। দুই বিপরীতধর্মী ও সংঘাতপ্রবণ পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে যেকোনো ধরনের রক্তক্ষয়ী মুখোমুখি সংঘর্ষ এড়াতে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ চরম সতর্কতা অবলম্বন করে। বিক্ষোভের সময়সীমা এবং মিছিলের রুট বা চলাচলের রাস্তার ওপর বিশেষ ও কঠোর শর্ত আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে সমাবেশগুলোতে যাতে কোনো ধরনের ঘৃণামূলক বক্তব্য বা উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কড়া নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
রেকর্ড নিরাপত্তা ব্যয় ও ব্রিটিশ প্রশাসনের কঠোর আইনি অবস্থান
লন্ডনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্রিটিশ পুলিশকে বিশাল এক নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পুরো এই নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করতে রাজকোষ থেকে প্রায় ৪৫ লাখ পাউন্ড ব্যয় হতে পারে। তবে এবারের সমাবেশে উগ্রবাদ রুখতে এক নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে; প্রথমবারের মতো নিয়ম করা হয়েছে যে, সমাবেশে কোনো বক্তা ঘৃণামূলক বক্তব্য দিলে তার জন্য আয়োজকদেরও আইনগতভাবে সমান দায়ী করা হবে। এর আগে আইনশৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কায় ‘ইউনাইট দ্য কিংডম’ সমাবেশে যোগ দিতে আসা ১১ জন উগ্র ভাবাপন্ন বিদেশি নাগরিককে যুক্তরাজ্যের মাটিতে প্রবেশ করতেই দেয়নি ব্রিটিশ সরকার। এই নিষিদ্ধ হওয়া ব্যক্তিদের তালিকায় ছিলেন পোল্যান্ডের রাজনীতিক ডমিনিক তারচিনস্কি, বেলজিয়ামের ফিলিপ ডেওইন্টার এবং ডাচ অ্যাক্টিভিস্ট ইভা ভ্লার্ডিঙ্গারব্রুক। বিক্ষোভের আগের দিনই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সাফ সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছিলেন, যারা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, ভয়ভীতি বা হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের প্রত্যেককে আইনের কঠোরতম মুখোমুখি হতে হবে।
ডানপন্থি উগ্রবাদ বনাম বর্ণবাদবিরোধী সংহতি
উল্লেখ্য, এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসেও টমি রবিনসনের ডাকে লন্ডনে একই ধরনের একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে। সেই কর্মসূচিতে মূলত জাতীয় ঐক্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের পক্ষে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল, যেখানে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এর (সাবেক টুইটার) মালিক ইলন মাস্কও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নিজের বক্তব্য পেশ করেছিলেন। তবে এবার সেই উগ্র ডানপন্থি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে ব্রিটেনের বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন ‘স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজম’। তারা উগ্রবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে নিজেদের বর্ণবাদবিরোধী মিছিলটিকে সরাসরি ফিলিস্তিনিদের নাকবা দিবসের মূল কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করে দেয়, যা নিপীড়িত মানুষের প্রতি বিশ্ববাসীর সংহতিকে আরও জোরালো করেছে।
বিশ্ববিবেকের কাছে এক তীব্র চপেটাঘাত
নাকবা দিবস কেবল একটি ঐতিহাসিক তারিখ নয়, এটি ফিলিস্তিনিদের বুকের ভেতর বয়ে চলা এক চিরন্তন দীর্ঘশ্বাস। যে ইসরাইলি বর্বরতার হাত ধরে ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের নিজ মাতৃভূমি থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছিল, সেই নিষ্ঠুরতার অবসান আজও হয়নি। দশকের পর দশক ধরে দখলদারিত্বের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে, নিজের স্বাধীন দেশের মাটিতেই আজ তারা অধিকারহীন যাযাবর। লন্ডনের এই বিশাল সমাবেশ মূলত সেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলা ফিলিস্তিনিদের দুঃখ-দুর্দশা আর ইসরাইলি পাশবিকতার বিরুদ্ধে এক তীব্র আন্তর্জাতিক চপেটাঘাত। বিশ্বনেতাদের দ্বিচারিতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লন্ডনের এই রাজপথ প্রমাণ করে দিল, ফিলিস্তিনিদের মুক্তির লড়াই ও তাদের স্বাধিকারের দাবি কোনো উগ্র চোখরাঙানি বা বুলেটের জোরে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়।












