SIR: প্রবঞ্চনার আরেক নাম
নাজনীন আজাদ: SIR-এর পুরো কথাটি হল— Special Intensive Revision. বাংলায় যার অর্থ— বিশেষ নিবিড় পুনর্মূল্যায়ন। কিসের পুনর্মূল্যায়ন? — ভারতীয় নাগরিকদের ভোটাধিকারের পুনর্মূল্যায়ন। অর্থাৎ বৈধ ভোটারদের চিহ্নিত করা হবে এই মূল্যায়নের দ্বারা।কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক নির্দেশিত এই পুনর্মূল্যায়ন হল ভারতীয় নাগরিকদের পক্ষে চরম অপমানজনক। যাঁরা এই দেশকে নিজের মাতৃভূমি হিসেবে জন্মাবধি জানেন, দেশকে ভালোবাসেন, এই দেশে চৌদ্দপুরুষের ভিটে যাঁদের, তাঁদের পক্ষে এই কেন্দ্রীয় নির্দেশনামা চরম অপমানজনক ও হেনস্তাকর।
প্রথমত, এই প্রসঙ্গে সবার আগে উঠে আসে সরকারের বৈধতার কথা। কেন্দ্রীয় সরকার কি পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশ দিয়েছেন? খেয়াল করে দেখুন— এই গণতান্ত্রিক দেশে যাঁরা অর্থাৎ যে সাধারণ জনগণ ভোট দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার নির্বাচন করলেন, আজ তাঁদের ভোটাধিকার বৈধ কিনা তা নিয়ে তাঁদেরই নির্বাচিত কেন্দ্রীয় সরকার প্রশ্ন তুলছেন। এতে তো তাঁরা তাঁদের সরকারের বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন তুলে ফেলেছেন। ভোটার যদি অবৈধ হয় তাহলে সরকার বৈধ হয় কীভাবে? অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের তথা প্রধানমন্ত্রীর তো অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।
দ্বিতীয়ত, সরকার যদি এটা বলতে চায় যে যাঁরা তাঁদের ভোট দেননি তাঁরা অবৈধ তাহলে প্রশ্নটা হল— বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার কি একনায়কত্ব কায়েম করতে চাইছেন?
কিম জন উনের একনায়কতান্ত্রিক উত্তর কোরিয়াতে নাগরিকদের ভোটাধিকারের প্রমাণ দিতে হয় না। সেখানে ভারতবর্ষের মত গণতান্ত্রিক দেশে এই প্রমাণ দেওয়ার বিষয়টি অতীব লজ্জাজনক। SIR নিয়ে সাধারণ ভারতীয় জনতা এবং BLO উভয়কেই যে পরিমাণ ভোগান্তি ও হেনস্থা সহ্য করতে হচ্ছে তা কল্পনাতীত।
প্রথমত, BLO দের ঘাড়ে যন্ত্রমানবের মত অকল্পনীয় কাজের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। অনেক BLO কাজের চাপ সহ্য করতে না পেরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন। কেন্দ্রীয় সরকারের এই তুঘলকী নির্দেশনার কারণে তাঁদের পরিবারের দায়িত্ব কি কেন্দ্রীয় সরকার নেবেন? জবাবের আশায় রইলাম। এবার আসি সাধারণ জনগণের ভোগান্তির কথায়। পুনর্মূল্যায়নের নামে বাদ পড়েছেন হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ যাঁরা কতশত বছর ধরে বংশানুক্রমে ভোট দিয়ে আসছেন। লাইনে দাঁড়িয়ে হিয়ারিং করতে গিয়ে কত ‘দিন আনি দিন খাই’ পরিবার অভুক্ত থেকেছেন।
বিশেষত একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের ভোটাররাই নির্বাচন কমিশন তথা কেন্দ্রীয় সরকারের মূল ‘টার্গেট’ হয়ে পড়েছেন। হিয়ারিং-এ উপস্থিত থেকেও সব নথিপত্র প্রমাণ দেখিয়েও এই সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষের নাম আজ ‘deleted’। অথচ কত অনায়াসেই অন্য সম্প্রদায়ের কত মানুষের নাম ফাইনাল ভোটার লিস্টে উঠে গেছে। এমন বহু তথ্য প্রমাণ আমরা চোখের সামনে পেয়েছি। কতশত লোক দুশ্চিন্তায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বা স্ট্রোক করে মারা যাচ্ছেন। তাঁদের পরিবারের দায়িত্ব কি? কতজন দুশ্চিন্তায় আত্মহত্যা পর্যন্ত করে ফেলছেন। যদি পরে তাঁরা বৈধ ভোটার (কেন্দ্রীয় সরকারের সংজ্ঞা অনুযায়ী) প্রমাণিত হন, তাঁদের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ সরকার কীভাবে দেবেন সেই প্রশ্ন রেখে গেলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। (হ্যাঁ নির্বাচন কমিশন তো এখন কেন্দ্রের হাতের পুতুল তাই প্রশ্নটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছেই রাখলাম।) পরিশেষে বলি, ভোটারদের বৈধতা খুঁজতে গিয়ে সরকার নিজেদের বৈধতা নিয়েই যে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে তা নিয়ে ভারতীয় জনগণের প্রশ্ন তোলা উচিত সম্মিলিতভাবে। নইলে অদূর ভবিষ্যতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষের জন্য এক বিশাল দুর্দিন অপেক্ষা করছে।












